সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা অনেক বিখ্যাত। আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি। যেমন: বেগম রোকেয়া, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং আরও অনেকে। বেশিরভাগ খ্যাতিমান মানুষই তাদের শিক্ষাজীবনে ছিলেন সফল। কারণ তাঁরা মনোযোগ দিয়ে শিখেছেন আর তা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তোমরা কি তোমাদের আশেপাশের এমন কিছু মানুষের কথা চিন্তা করতে পার, যাঁরা শিক্ষার মাধ্যমে খ্যাতিমান হয়েছেন?
দলগত কাজ
|
এসো আমরা আজ দুজন খ্যাতিমান মানুষের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানি। দেখি কী করে তারা শিক্ষার মাধ্যমে খ্যাতিমান হয়ে উঠলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা নিশ্চয়ই তোমরা সবাই জান। তিনি ছিলেন একজন মহান পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, লেখক এবং দানশীল ব্যক্তিত্ব। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদও অলংকৃত করেন। তাঁর জ্ঞান ও কর্মদক্ষতার মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৮৫৫ সালে তাঁকে বিদ্যালয়ের বিশেষ পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ করে। এ তো গেল তাঁর চাকরি জীবনের কথা। তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি অনেক সম্মাননা এবং ফেলোশিপ পেয়েছেন। বিদ্যাসাগর অনেক বই লিখেছিলেন, বিশেষ করে শিশুদের জন্য তিনি অনেক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন। বাংলা গদ্য লেখায় তিনি নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বিধবাবিবাহ প্রবর্তন এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধে অনেক যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন। তাঁর নিরলস চেষ্টার ফলেই পরবর্তীতে সরকার আইন করে বাল্যবিবাহ বন্ধ ও বিধবাবিবাহ চালু করে। বিদ্যাসাগর শিক্ষার প্রসারে, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে নিজের অর্থ ব্যয় করে অনেক বিদ্যালয় চালু করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদেরও এ কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতেন। বলা হয়ে থাকে, বিদ্যাসাগর তাঁর মোট আয়ের অর্ধেক দরিদ্রদের সাহায্যের জন্য আলাদা করে রাখতেন। এতসব মহান কীর্তির জন্য বিদ্যাসাগরকে তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; এখনো তাঁকে আমরা অসীম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। বিদ্যাসাগরের এতসব মহান কীর্তির পিছনের রহস্য কী? তিনি অবশ্যই অসাধারণ সৎ, সাহসী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একজন ব্যক্তি ছিলেন। এর পাশাপাশি তাঁর অনন্য শিক্ষাজীবনের ভূমিকাও কম নয়। শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। সে কারণে তাঁর বাবা-মা অভাব-অনটন সত্ত্বেও তাঁকে পড়াশোনা করিয়েছেন। গ্রামের পাঠশালার পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর বাবা-মা তাঁকে আরও পড়াশোনার জন্য কলকাতায় পাঠান। বলা হয়, গ্রাম থেকে কলকাতায় যাওয়ার সময় রাস্তায় বসানো মাইলফলক দেখে দেখে তিনি ইংরেজি সংখ্যা শিখে ফেলেন। কলকাতায় তিনি বাড়িতে আলোর অভাবে অনেক সময় রাস্তার লাইটপোস্টের আলোতে পড়াশোনা করতেন! বিদ্যাসাগর কিন্তু তাঁর বাবা-মার দেয়া নাম নয়। এটি একটি উপাধি। তিনি ১৮২৯ থেকে ১৮৪১ সাল পর্যন্ত কলকাতা সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনা করেন। এসময় তিনি শিক্ষায় অসামান্য সাফল্যের জন্য কলেজের সব পুরস্কার এবং বৃত্তি লাভ করেন। সব বিষয়ে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখে কলেজ কমিটি তাঁকে 'বিদ্যাসাগর' উপাধিতে ভূষিতে করে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯। তাঁর এই অসাধারণ শিক্ষাজীবনই পরবর্তীতে তাঁর খ্যাতিমান হয়ে ওঠার পিছনে অনেক অবদান রাখে। আমরা তাঁকে সবসময় অনুসরণ করার চেষ্টা করব। তাহলে আমাদের জীবনও অনেক সুন্দর হবে। |
বেগম রোকেয়া বেগম রোকেয়ার কথাও নিশ্চরই তোমাদের কারো অজানা নয়। তিনি একজন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং সমাজসংস্কারক ছিলেন। বাংলাদেশের রংপুরে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারীকে বলা হয় বাংলায় মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ। নারীমুক্তির জন্য তিনি মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন; মুসলিম মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নারী জাগরণের জন্য তিনি অনেক প্রবন্ধ, ছোটো- গল্প, কবিতা ও উপন্যাস লিখেছেন। মুসলিম নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য তিনি 'আঞ্জুমানে খাওরাতিনে ইসলাম' নামে একটি প্রতিষ্ঠানও সৃষ্টি করেছিলেন। এসব কাজের জন্য তাঁকে অনেক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো তাঁর লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আসেননি। তাঁর এই সব অনন্য অবদানের পিছনে রয়েছে শিক্ষার ভূমিকা। তখনকার দিনে মুসলিম মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো হত না। বেগম রোকেয়াও বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষা নেবার সুযোগ পাননি। কিন্তু শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অসীম আগ্রহ। তাই তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে বাড়িতে বাংলা ও ইংরেজি শিখতে সাহায্য করেছেন। তিনি শিক্ষার পিছনে সবচেয় বেশি অনুপ্রেরণা পেরেছিলেন তাঁর স্বামীর কাছ থেকে। স্বামীর অবিরাম অনুপ্রেরণা ও সহায়তার ফলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা এবং পত্র-পত্রিকায় লেখা শুরু করেন। এই পড়াশোনা এবং সাহিত্যচর্চা তাঁর মনের দুয়ার খুলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, এদেশের নারীদের মুক্তির জন্য শিক্ষা ও অধিকার সচেতনতার বিকল্প নেই। শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত এই চেতনাবোধ থেকেই তিনি নারীদের মুক্তির জন্য এগিয়ে আসেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর চেতনা ধারণ করে অনেকে মুসলিম নারীদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁদের অনেকেই ছিলেন বেগম রোকেয়ার ছাত্রী। আজ যে মুসলিম নারীরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করছে, সমাজের নানা ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে তার পিছনে বেগম রোকেয়ার অবদান সবচেয়ে বেশি। তাই আজও আমরা তাঁকে এবং তাঁর অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। |
Read more

